প্রাথমিকে শিক্ষক  নিয়োগঃ প্যানেল নাকি নতুন সার্কুলার?

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগঃ প্যানেল নাকি নতুন সার্কুলার?


শাওন আহমেদঃঃ আলো ছাড়া পৃথিবী যেমন অন্ধকার, বিদ্যার আলো ছাড়া জাতি তেমন পথভ্রষ্ট। একটি দেশের উন্নতির মূলে শিক্ষা হচ্ছে অকৃত্রিম হাতিয়ার। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের শিশুদের জীবনের প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা। প্রতিটি অভিভাবক তার প্রজন্মকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর ভাবে, আমার সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছে বিদ্যালয়। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে যদি শিক্ষক সংকট থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রাষ্ট্র ঠকাচ্ছে। এখনো বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে ২৮ হাজারের অধিক পোস্ট ফাঁকা পড়ে আছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেন আমলাতান্ত্রিক লালফিতা দৌরাত্ম শুরু হয়েছে। ২০১৪- ২০১৮ পর্যন্ত কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না দেওয়ায় মূলত এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এই সংকট দূর করা এখন জীবন মরণের প্রশ্ন। কিভাবে সমাধান? প্যানেল না নতুন সার্কুলার???? এই নিয়ে এদেশের প্রায় ২৫ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত বেকার দ্বিধায় আছেন। এদিকে এমসিকিউ ও ভাইবায় উত্তীর্ণদের দাবি,আমরা ৩৭ হাজার অবশ্যই চাকুরী পাওয়ার যোগ্য, প্যানেলের মাধ্যমে আমাদের নিয়োগ দিলে এই সংকট দূর করা সম্ভব। এর পিছনে তারা বিভিন্ন যুক্তিও উপস্থাপন করছেন। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের প্যানেল নিয়োগের দাবি সরকারের কাছে পেশ করছেন। প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ দিলে অবশ্যই এই সংকট যেমন কিছুটা হলেও দূর হবে, বেকারত্ব-ও কিছুটা ঘুচবে। এটাই কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে? প্রায় ২৫ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত বেকার কি করবে তাহলে? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে,,। যারা নতুন গ্রেজুয়েট হয়েছে তারা কি করবে? তাদের মন্তব্য, প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ দিলে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় ৫ বছর পর্যন্ত প্রাথমিকের কোনো সার্কুলার পাবেননা। এতে দেশ এক বিরাট সমস্যায় পড়তে পারে। তাদের দাবি, প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ দিলে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের বাছাই করা অসম্ভব। তারা বলছেন, দেশের বেকারত্ব ও শিক্ষক সংকট দূর করতে অবশ্যই নতুন সার্কুলার দিতে হবে, তাহলে, সরকার দেশের সুপার ট্যালেন্ট শিক্ষক জাতিকে উপহার দিতে পারবে। তারা হবে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন ও সেরাদের সেরা। তাছাড়া, এই মূহুর্তে বিশ্ব মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এই মূহুর্তে শিক্ষকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নেই। তাই এখন প্যানেল নিয়োগের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। তাদের দাবি দেশের সদ্য পড়াশোনা শেষ করা ও যাদের বয়স প্রায় শেষের দিকে চলে গেছে, সবার দিক বিবেচনা করে সরকারের উচিত দ্রুত সার্কুলার দেওয়া, দেশ স্বাভাবিক হলে নিয়োগ পরিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক জাতিকে উপহার দেওয়া। সাধারণ লজিকে চিন্তা করলে দেখা যায়, প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ কখনো প্যানেল প্রত্যাশীদের অধিকার নয়। এটা একটি অপেক্ষমাণ তালিকা মাত্র। আর তা থেকে নিয়োগ দিতেই হবে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আর এটা কোনো মৌলিক অধিকারও নয় যে রিট করে ফিরে পাওয়া যাবে। যদি প্যানেল নিয়োগের দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক হয়ে থাকে তাহলে তাদের জন্য হাইকোর্টের দরজা খুলা আছে, তারা যেন ১০২ ধারায় রিট করে।

আর কিছু অতি- উৎসাহী প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি আছেন যারা প্যানেলের নিয়োগকে তালগাছে তুলে দিয়েছেন। আপনাদের ভাবা উচিত ৫৬ হাজার বর্গমাইল নিয়ে, শুধু উপজেলা, জেলা বা ইউনিয়ন নিয়ে ভেবে পার্লামেন্টে প্যানেলের পক্ষে আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে প্রভাবিত করে দেশের সমস্যা আর বাড়াবেন না। এদেশের সকল বেকারদের একবার হলেও আবেদন করার সুযোগ করে দিন। প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ মানে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নেতিবাচক প্রভাব এবং বেকারদের সাথে তামাশা ও জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

যদি প্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে যারা সার্কুলার পাবেননা তারা সার্কুলারের দাবিতে আন্দোলন করবে এটাই স্বাভাবিক। অনেকে আবার আত্মহত্যার পথ-ও বেছে নিতে পারেন। প্রাথমিকের শিক্ষক হতে অনেকেই পড়াশোনা করে দিনরাত এক করে ফেলছে। কিন্তু যখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বন্ধ হয়ে যাবে তখনই শুরু হবে হতাশা। সাথে প্রতিবছরই লাখ লাখ প্রার্থী নতুন করে চাকুরির বাজারে প্রবেশ করবে কিন্তু সার্কুলার না পেয়ে আন্দোলন করে সরকারকে চাপের মুখে ফেলবে। এটা দেশের সরকারের জন্য অবশ্যই জাতীয় সমস্যা হবে। তাই পার্লামেন্টে প্যানেল নিয়ে কথা বলার আগে দেশের ২৫ লক্ষ্ উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের হাহাকার ও তাদের চাপ সরকারকে অসুবিধায় ফেলবে কিনা এটা সাংসদদের মাথায় রাখা উচিত। এদেশের তরুণদের বিশ্বাস বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকার প্রতিবছর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অব্যাহত রাখবে ও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেন আমলাতান্ত্রিক লালফিতা দৌরাত্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ও জাতিকে জ্ঞানশূন্য না করে এই প্রত্যাশায় প্রতি বছর সার্কুলার জারি করে দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে জাতির কারিগর নির্বাচন করা উচিত।

লেখকঃ বিসিএস পরীক্ষার্থী।

মন্তব্য