শিক্ষায় সিলেটিরা  পিছিয়ে কেন?

শিক্ষায় সিলেটিরা পিছিয়ে কেন?


চৌধুরী মোহাম্মদ ইমরানঃঃ চাকুরি যুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের মানুষ বরাবরই পিছিয়ে আছে। থাকবেই বা না কেন? আমাদের স্বপ্ন তো চাকরি করা নয়। আমাদের স্বপ্ন বিনা শিক্ষা নিয়ে লন্ডন আমেরিকা আর কানাডা গমন করা।

ছেলে যখন ছোট থাকে তখন সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি
বাবাই স্বপ্ন দেখে আমার ছেলেকে লন্ডনে পাঠাব, ইউরোপে পাঠাব। ছেলে যখন এস এস সি পাশ করে তখন তাকে কিনে দেয় বাইক। কিছু দিন পর লন্ডন তো চলেই যাবে। দেশে একটু ঘোরাঘুরি করুক।

ছেলে মেয়েকে ভালো কলেজে ভর্তি করার চিন্তা যখন দেশের অন্য সব বাবা মা করেন তখন আমাদের সিলেটের বাবা মা চিন্তা করেন আর তো কিছু দিন। আরেকটু বড় হলেই বিদেশ পাঠিয়ে দিব। দেশে থেকে কিছু করতে পারবেনা। চাকরি সে তো সোনার হরিণ। আমার ছেলেকে দিয়ে চাকরি হবে না।

আর মেয়েদের জন্য খুঁজে ইউরোপ আমেরিকার জামাই। মেয়ে সুন্দরী হলে তো আর কথাই নাই। এই মেয়েকে আমি ইউরোপিয়ান ছাড়া বিয়ে দিবই না। তাদের কথা ভুলও না। সত্যি সত্যি এসব মেয়দের বিয়ে হয় ইউরোপ আমেরিকার পাত্রদের সাথে।

এত কথা কেন বলছি। এত কথা বলার পিছনে কারণ একটাই আমাদের সিলেটের মানুষের অজ্ঞতা। তথ্য আর প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে তখন আমরা নিজেকে বিদেশের মাটিতে চাকর বানানোর ভাবনায় হয়রান।
আমার কথাগুলো হয়ত অনেকের কাছে খারাপ লাগবে৷ লাগারই কথা কিন্তু সত্য সব সময় কঠিন এবং কঠু।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এ চাকরির সুবাদে আমাদের সিলেট অঞ্চলের অনেক লন্ডনিদের সাথে পরিচয় হয়। যারা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারে ঠিকই কিন্তু ইংরেজি লেখা পড়তে পারেনা। শুদ্ধ বাংলা তো জানেই না, সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া কিছুই বুঝেনা। তাদেরকে সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় বিমান কর্মীদের। কাউকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য হলো সচেতন করা। আমাদের অন্তত নূন্যতম শিক্ষা নিয়ে পরে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাওয়া উচিত। প্রবাসীরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা তাদেরকে ছোট করছিনা। আমি এটুকু বলছি তারা যদি শিক্ষা নিয়ে কিংবা ট্রেনিং নিয়ে বিদেশ গমন করত তাহলে প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারত৷ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদেরকে আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা৷

বিভিন্ন চাকুরির পরীক্ষায় সিলেটের ছেলে মেয়েরা অংশগ্রহণ করে ঠিকই কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে মাত্র দুই এক শতাংশ।
ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখেন সিলেটের যত সব চাকরির ক্ষেত্র আছে সেখানে বসে আছে অন্যান্য জেলার বাসিন্দা৷ একটু চোখ বুলিয়ে আশে পাশের সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেখুন। সেখানে সিলেটের লোক নেই বললেই চলে। আমাদের নিজেদের লোক না থাকার অভাবেই অন্য জেলার লোককে সেখানে জায়গা করে দিতে হচ্ছে৷

আর আমরা বিদেশ যাওয়ার ধান্ধায় পড়ে একদম লেজে গোবরে অবস্থা। লেখাপড়ার দিক দিয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে৷ একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরি, প্রাচীন বিদ্যা পিট সিলেটের সুনামধন্য এম সি কলেজ, ইন্টারমিডিয়েট এর জন্য সারা দেশের সেরা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সেখানে সিলেটিদের সংখ্যা নেহায়েত কম। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বি ইউনিটে সিলেটি নেই বললেই চলে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েরও একই অবস্থা।

কিন্তু কেন? আমরা যারা বাহিরে যাচ্ছি তারা যদি উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতাম তাহলে সেটি অন্য কথা কিন্তু আমরা ক’জন উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছি সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এখনই সময়। আমাদেরকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমাদের সিলেট অঞ্চলের অবিভাবকদেরকে সচেতন হতে হবে। লন্ডন কিংবা ইউরোপ পাঠাতে হলে অবশ্যই সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার পর পাঠাতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা শক্তিই কেবল পারে আমাদেরকে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে।

আমার প্রবল ইচ্ছা সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে সরকারি বেসরকারি চাকুরি করবে। তাদেরকে ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে। চাইলেই সম্ভব।
মূলকথা আমাদেরকে শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে। চাকুরিই জীবনের সব নয়। একজন শিক্ষিত ব্যক্তিই পারে সমাজকে এগিয়ে নিতে। আমাদের সিলেটের মতো শান্তি প্রিয় মানুষ দেশের অন্য কোথাও নেই। ভালোবাসি সিলেটের প্রতিটি ধূলিকণাকে।

লেখকঃঃ সিনিয়র অফিসার, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

মন্তব্য