ছাতিম সুবাসে মাতোয়ারা

ছাতিম সুবাসে মাতোয়ারা


অ আ আবীর আকাশঃ সারা বাংলাদেশ ছড়িয়ে গেছে দারুণ এক সুন্দর সুগন্ধে। ইট পাথরের শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের পরতে পরতে এমন কোন জায়গা নেই যে, এই দারুণ মিষ্টি সুগন্ধে মেতে উঠেনি। এমন কোন নাগরিক তথা জীব-জানোয়ার নেই যে, এই মিষ্টি সুগন্ধ তার নাকে এসে মিলায়নি। হঠাৎ করে তাকে বিমোহিত করেনি। পথিক মোহিত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে যায় ছন্দোবদ্ধ সুগন্ধে। সুগন্ধটি কিসের, কে বলতে পারেন?
শরীরের দুর্গন্ধ থেকে পরিত্রান পেতে কেউ কেউ সুগন্ধ মাখান। কিন্তু পৃথিবীজোড়া সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছেন কে? কত টাকার সুগন্ধ হলে সারা পৃথিবী সন্ধ্যার পুর্বাহ্ন থেকে পরদিন সকালের সূর্য তেজস্ক্রিয় ছড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীময় সুগন্ধে ভরিয়ে দিতে পারে।
চন্দনকুটির আমার ভাঙা বাড়ীর দুপাশে দুইটা ছাতিম গাছ লাগিয়েছি পুষ্পঘ্রাণে মাতোয়ারা হওয়ার আশায়। সত্যি দারুন সুমিষ্টঘ্রাণে সুখনিদ্রা যাই। দীর্ঘ রজনী জেগে যখন সাহিত্যভূবনে ডুবে থাকি তখন আমাকে আলোড়িত করে ছাতিম সুবাস। পঞ্চম শ্রেনী পড়ুয়া ইমতিয়াজ যখন জানতে পারলো ছাতিম একটি প্রকৃতিবান্ধব বৃক্ষ,সুবাসিত পুষ্পকরথ তখন থেকে সেও গাছের প্রতি যত্নবান হতে শুরু করলো। প্রথম শ্রেণী পড়ুয়া আফসানা মীম তানহা বললো, আব্বু আমাকে দু’থোকা ফুল পেড়ে দেন।একথা শুনে পাশ থেকে ইমতিয়াজ তাকে বোঝাতে থাকে -না, মনি ফুলেরা রাতে আমাদেরকে সুবাস দিবো।ফুল ছিঁড়লে আর ঘ্রাণ ছড়াবে না,সুবাস দিবো না। তুমিও পড়তে বসলে আর ছাতিমের সুমিষ্টি সুবাস পাবে না। একথা শুনে মীম বললো, আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আর ফুল ছিঁড়বো না।
এমন একটি পুষ্প-বৃক্ষ যেখানে থাকে সে নিজেই জানান দেয় তার অবস্থানের কথা। ছড়িয়ে দেয় তার পুষ্পঘ্রাণ। তাকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়না। দু’শ তিন’শ গজ দূরে থাকলেও বলে দেয়া যায় পুষ্প-বৃক্ষটি কোথায় রয়েছে।সুগন্ধ ছড়ানো পুষ্প-বৃক্ষটির নাম ছাতিম।
বাংলায় ছাতিম গাছ বলা হয়। সংস্কৃতে নাম সপ্তপর্ণী। ছাতিম চির সবুজ বৃক্ষ। উচ্চতা বিশ থেকে পঁচিশ মিটার, দুধের মতো সাদা তেতো রস থাকে। ছাল অসমতল ধূসর বর্ণ, শাখা বিশিষ্ট। ডালপালা লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে, স্তরসৃষ্টি করেও এক রকম নিবিড় ঘন আবেশ রচনা করে। গন্ধের মধ্যে নেশার ঝাঁঝ আছে। ছাতিম এইভাবে নিজেকে ঘোষণা করে। 
গুড়ি :মোটা মনে হয় যেন শাখা দিয়ে ঠেকানো। পাতা দশ থেকে পনের সেমি লম্বা। পত্র সংখ্যা সাত। ফুল : ছোট সাদা থোকায় থোকায় ফোটে।
ফল : ত্রিশ থেকে ষাট সেমি লম্বা সরু, এক বৃন্তে দুটি করে ঝুলে থাকে।
ছাতিম বা সপ্তপর্ণী চির সবুজ বড় গাছ। শরতে তার ফুল ফোটে। শরৎ শঙ্কর ঋতু। দিনে গরম-রাতে ঠান্ডা, শহরে রাতের ঠান্ডা অনুভব কম হলেও গ্রামে তার প্রভাব প্রবল। এ সময় উল্লেখযোগ্য ফুল বলতে শিউলী ও ছাতিম। 
ছাতিম যখন ফোটে তার সু-গন্ধের প্লাবনে চারিদিক মেতে ওঠে। ছাতিমের এই সুবাসিত ভালোবাসাকে অবহেলা করে কার সাধ্য। ফুলের স্তবকে- স্তবকে ফোটার নির্ঝর লক্ষ্য করার মতো। বহুদূর পর্যন্ত সে প্রবল উগ্র গন্ধের ঐশ্বর্য ছড়ায়।
ফুল অনুজ্জ্বল, সবুজাভ সাদা। দূর থেকে হঠাৎ দেখা যায় না। কিন্তু সবগুলো ডালের আগায় সাতটি পাতার বুকে ফুলগুলো বের হয় ছাতার মতো গোল হয়ে। ছাতিম নাম সার্থক এইজন্য। তার ছায়া নিবিড়, গন্ধ নিবিড়।
ছাতিম ফুলের নিচের অংশ নলের মতো এবং নল-মুথের পাঁচটি পাঁপড়ি ইস্যু বাঁকানো। পরাগচক্র গভীরে থাকে। গর্ভকোষ দু’টি আংশিক যুক্ত থাকে, এজন্য ফল জোড় বাঁধা। ফল সজনের মতো বা বরবটির মতো। ফুলের মতোই ফল থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে। সারা গাছে ঝুলে থাকা ফল দেখার মতো। 
ঝুলে থাকা ফলগুলি যেন সুন্দরী রমনীর আলুলায়িত চুল। বসন্তের দিকে ফল পাকে। বীজ রোমশ ও হাওয়ায় ভেসে চলে যায়। বীজ থেকে সহজে চারা জন্মে। গাছের বৃদ্ধিও হয় দ্রুত। ছাতিমের আকৃতিতে একটি বৈশিষ্ট্য আছে। তার ডালপালায় ছড়ানো ভঙ্গিটি কয়েকটি জোড়া দেওয়া ছাতার মতো।
এর সরল উন্নত কান্ড কিছুদূর উপরে ওঠে হঠাৎ শাখা-উপশাখায় একটি চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি করে আবার এক লাফে একে ছাড়িয়ে অনেক দূর উঠে এমনি করে ঘন পাতার কয়েকটি চাঁদোয়ার সৃষ্টি করে। চন্দ্রা তৈরির এই বৈশিষ্ট্য শুধু ডালপালায় নয় তার পাতাও বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে। একই গ্রন্থি সাতটি পাতার চক্রাকার বিন্যাস শাখার মতোই সুন্দর। 
শাখাগুলো ডাঁটার চারপাশে চক্রাকারে কিছু সংখ্যক পাতা বা ফুল দ্বারা সাজানো থাকে। ঠিক যেন ছাতার শিকে। ফুল ও সে রকম চক্রাকার। ছাতিমের সংস্কৃতিনাম সপ্তপর্ণী। পাতা সাধারণত সাতটি হয় বলে এই নাম। আর ইংরেজিতে ডেভিলস্ ট্রি ও ভিটাবার্ক ট্রি। উদ্ভিদতাত্ত্বিক ‘স্কলারিস’ নামের অর্থ এই যে, আগে এই গাছের কাঠ দিয়ে স্কুলের ছাত্রদের জন্য শ্লেট তৈরি হতো। সাধারণ মানুষের কল্পনায় এই গাছের একটি যাদুকরী দুষ্টশক্তি জড়িত আছে মনে করে বলে এর অপর নাম শয়তান গাছ। পশ্চিম ভারতের লোকেরা এর ছায়ায় বসতে চায় না।
আদিবাসী লোকেরা তো আরো একদম বাড়িয়ে আছে, তারা এই গাছের ছায়াও মাড়ায় না। এই গাছের তলায় ঘুমানো মানে নির্ঘাত মৃত্যু। গাছের প্রহরী শয়তান এই সুযোগে তার কাজটি করে নেয় বলে তাদের বিশ্বাস। শয়তান এই গাছ পাহারা দেয় মনে করে বলে কেউ এই গাছের ক্ষতিও করে না।
ছাতিমের পুরুছালের ভিতরটা সাদা দানাদার, কিন্তু উপরটা খসখসে। সারা গাছে সাদা দুধের মতো আঠাঁ বা ক্ষীর আছে। ছাল, পাতা, ফুল, ক্ষীর ওষুধে ব্যবহৃত হয়। 
কুষ্ঠে, জ্বরে, সান্দমেহে, হিক্কানিঃশ্বাসে, দাঁতের যন্ত্রণায়, হাঁপানিতে, স্তনদুধের স্বল্পতায়, গাঁটের ব্যথায়, সর্দি বসায়, শ্বাসকষ্টে, দুষ্টব্রণে ছাতিমের নানা অংশ ঔষধের কাজে ব্যবহার করা হয়। জ্বর ধীরে ধীরে নামায় বলে- ম্যালেরিয়াতেও উপকারী। চর্মরোগেও ছাতিম ফলপ্রদ।
ছাতিম যেন এসব রোগে ছাতার মতো ছায়া দিয়ে আগলে রাখে। ছাতিমের কাঠ দিয়ে খুব সাধারণ ফার্নিচার, প্যাকিংকেস, চায়ের পেটি, পেনসিল এবং দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি হয়। ছাতিম গাছ সহজে মরে না। ডালপালা কাটলেও আবার দ্রুত ডাল বের হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তি নিকেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর প্রমাণপত্রে সপ্তপর্ণীর পত্র দেওয়া হয়।

উপকারিতা:
১। ছাতিম গাছের ছালচূর্ণ করে গুল

ঞ্চের রস মিশিয়ে খেলে এবং এই গাছের ছাল থেঁতো করে সিদ্ধ করে এই পানি দিয়ে গোসল করলে কুষ্ঠ রোগ ভালো হয়।
২। জ্বর হলে ছাতিম গাছের ছাল সিদ্ধ করে সেই পানি দুইবেলা সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়।
৩। ছাতিম গাছের রস গরম দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে কাশি ভালো হয়ে যায়।
৪। দাঁতে পোকার যন্ত্রণা হলে ছাতিমের আঠা পোকা লাগা দাঁতের ছিদ্রে দিন উপকার পাবেন।
৫। হাঁপানি হলে ছাতিমের ফুল চূর্ণ করে পিপুল চূর্ণ করে দইয়ের সাথে মিশিয়ে খেলে হাঁপানি কমে যায়।
৬। বাতের ব্যথা হলে ছাতিমের ছাল সিদ্ধ করে সেবন করলে ব্যথা কমে যায়।
৭। এসিডিটি হলে ছাতিমের ছাল বা ফুল চূর্ণ করে সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়।

তথ্য সহযোগিতাঃ ইন্টারনেট।লেখকঃ কবি প্রাবন্ধিক কলামিস্ট মানবাধিকার ও সাংবাদিক।সম্পাদকঃ আবীর আকাশ জার্নাল।

মন্তব্য