নবীগঞ্জে উৎসবের সাথে আছে ভোটারদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক

নবীগঞ্জে উৎসবের সাথে আছে ভোটারদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক


নবীগঞ্জ প্রতিনিধি :: নবীগঞ্জ পৌরসভার ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। আজ বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) রাতেই শেষ হচ্ছে প্রচারণা। তাই শেষ মূহুর্তে চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে পাড়া-মহল্লা সরগরম হয়ে উঠেছে। তবে চায়ের দোকান, আড্ডা থেকে শুরু করে সব জায়গায় সুষ্ঠু ও সংঘাতহীন নির্বাচন হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভোটাররা।

পৌরসভার চরগাঁও এলাকায় ঘুরবার সময় সকালে কথা হয় বারেক মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সুষ্ঠু ভোট হোক। কাইজ্জা (মারামারি) যেন না হয়। তবে এবারের নির্বাচনে কাইজ্জা (মারামারি) হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি।’ কারণ হিসেবে বারেক মিয়া জানান, এখানে বর্তমান মেয়র ও বিএনপির প্রার্থী ছাবির আহমদ চৌধুরীর বাড়ি। এই গ্রামেই আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক বড় বড় নেতার বাড়ি। ভোটের সময় আইলে তারা দল ভুলে এক হয়ে যান। এবার এই গ্রাম থেকে বিএনপির প্রার্থী ছাবির আহমদ চৌধুরী দাঁড়িয়েছেন। গত বছর তার কাছে এই গ্রামেরই আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এবার তিনি একক হওয়ায় গ্রামটির মানুষ প্রতীকের চেয়ে আঞ্চলিকতার প্রভাব ধরতে রাখতে চাইবে। তাই সংঘর্ষের আশঙ্কা তার।

তার কথার সাথে মিল পাওয়া গেল মিছির আলীর কথাও। তিনি বলেন, ‘মানুষ যদি প্রতীক দেখে সুন্দরভাবে ভোট দেয় সমস্যা নাই। কিন্তু এখানে আঞ্চলিকতার প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হবে বলে মনে হচ্ছে। এটা করলে সংঘর্ষ হবে। সংঘাতহীন একটা নির্বাচন চাই আমরা।’

সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দুপুর বেলা ওসমানী রোডের একটি চা-স্টলে বসে কথা হয় অনেকের সাথে। গন্ধা গ্রামের আবুল হোসেন বললেন, ‘উন্নয়ন দরকার। আমাদের এলাকায় সড়ক বাতি নেই। যে উন্নয়ন করত পারব তারেই ভোট দিব আমরা। গ্রামে এটা নিয়েই আলোচনা চলছে।’

একই গ্রামের আব্দুস সহিদ বললেন, ‘ভোট নিয়ে কোনো ভয় নেই। ভোটে কোনো সমস্যা হবে না। প্রশাসন খুব শক্ত অবস্থানে আছে’ তবে স্টলের সামনেই দাঁড়ানো আল-আমিন ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, ‘দলীয় নির্বাচন হলেই অনেক কেন্দ্রে সহিংসতা হয়। এবারও সেই আশঙ্কা আছে। দলীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়বে। তাছাড়া বাজারের মিটিং-এ পেট্রল বোমা ফাটায় মানুষ আতঙ্কে আছে। মানুষের জানের (প্রাণ) মায়া তো আছে।’

এরপর এই এলাকার ঠিক উল্টোদিক গয়াহরি এলাকায় প্রচারণাতে পাওয়া গেল কয়েকজন যুবকে। তারা এক কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য প্রাচারণা করছেন। তাদেরই একজন ইকবাল বলেন, ‘ভোটের মাঠে সকলেই শান্তিপূর্ণ প্রচারণা করছেন। তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে চায়। তবে কিছু এলাকায় আঞ্চলিকতার প্রভাব আছে। মানুষ মুখ খুলছে না।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী সদরুল মিয়া বলেন, ‘আমার ভোট ভোট আমি দিতে চাই। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যদি দেখি কেউ আমার ভোট দিয়ে দিয়েছে, এটা খুব দুঃখজনক। তবে এবার সেটা হবে না। প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করেছে। অনেক পুলিশ থাকবে বলে শোনেছি।’

কানাইপুর এলাকায় আজিজ মিয়া বলেন, ‘দেখা যারতো আমাদের গ্রামে কোনো সমস্যা নেই। কথাবার্তায় যেটা মনে অর (হচ্ছে) কেউ মার্কা কেউ ব্যক্তি দেখে ভোট দিবে।’

ময়ানগর এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. আলী বলেন, ‘আমার এলাকায় কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সবাই সতর্ক আছি। কাইজ্জা (মারামারি) যাতে না হয়, এই জন্য।’

আলাপকালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম রসুল চৌধুরী রাহেল বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। এখানে যুদ্ধ করছি না। জনগণ আমার সাথে আছেন। কিন্তু উনি (বিএনপি প্রার্থী) আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। ভোটের দিন বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন আসার কথা বলেছেন। বহিরাগত লোক দিয়ে একটা বিশৃঙ্খলা করতে চাচ্ছেন তিনি। কেন্দ্রের পাশে লাঠিসোটা থাকবে আগে থেকে, এটা তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন।’
রাহেল আরও বলেন, ‘নির্বাচিত হলে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গরিব মানুষের ওপর কর কম ফেলা, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির করব।’

এখন পর্যন্ত পরিবেশ ভালো বলে জানিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুবুল আলম সুমন বলেন, ‘জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী’। তবে ভোটারদের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক আছে বলে জানিয়ে এই প্রার্থী বলেন, ‘এটা আমার বক্তব্য না। ভোটারদের কথা। তারা বলছেন আমাদের এখানে পেট্রল বোমার একটা ঘটনা ঘটছে। এটার পর তারা (ভোটারা) আতঙ্কে আছেন।’

আলাপকালে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র ছাবির আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছি। মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ ভালো। ১৬ তারিখ বোঝা যাবে।’

আলাপকালে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা দেবশ্রী দাস পার্লি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ নেই। সবগুলো কেন্দ্রকেই আমরা সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। সেই মোতাবেক প্রতিটি কেন্দ্রেই একজন করে ম্যাজিস্ট্রেটসহ ১০ জন পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে। তাছাড়া তিনটি মোবাইল টিমসহ একাধিক স্ট্রাইকিং ফোর্স রাখা হচ্ছে। যারা সার্বক্ষণিক প্রতিটি কেন্দ্রেই টহল দেবে। এতে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় ধাপে আগামী ১৬ জানুয়ারি এই পৌরসভায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এখানে আওয়ামী লীগের গোলাম রসুল চৌধুরী রাহেল, বিএনপির ছাবির আহমদ চৌধুরী ও স্বতন্ত্র মাহবুবুল আলম সুমন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৪১ জন ও নারী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন ৯জন। ৯টি ওয়ার্ডের ১০টি কেন্দ্রের ৪৮টি বুথে ভোট নেওয়া হবে। মোট ভোটার ১৮ হাজার ৭৭৭।

মন্তব্য